Bangla Golpo লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Bangla Golpo লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, মে ২৯, ২০১১

Child Golpo




খেলান-দোলানের গল্প


চিরায়তা পূর্ণা চক্রবর্তী (বয়স-১০)
অনেক দিন আগেকার কথা। এক দেশে এক রাজা তার এক রানি কে নিয়ে থাকতেন। সেই রাজার ভারী দুঃখ। একে তো দেশে কোন সুখ-শান্তি নেই, তার ওপরে রাজার কোন ছেলেমেয়ে নেই। একদিন রাজার দরবারে এক সন্ন্যাসী এলেন। তিনি বললেন, "মহারাজ,আমি আপনার দুঃখ জানি”। বলে তিনি একটি গোলাপ ফুল দিলেন, তারপর আবার বললেন, "এই ফুল যদি আপনি পাঁচদিন জলে রেখে, পিষে আপনার রানিকে মধু দিয়ে খাওয়ান তাহলে আপনার সব দুঃখ ঘুচে যাবে”। এই বলে তিনি সেই ফুল রাজার হাতে দিয়ে দরবার থেকে চলে গেলেন। রাজা ঠিক সন্ন্যাসীর কথা মত ফুলটাকে পাঁচদিন জলে রেখে পিষে মধু দিয়ে রানিকে খাওয়ালেন। তারপরে রানির দুই জমজ ছেলে হল। তাদের নাম দেওয়া হল খেলান আর দোলান। তাদের এইরকম নামের কারন আছে। খেলান সবসময় খেলতে থাকে আর দোলান সবসময় দুলে দুলে ঘুমোয়। তাদের কাজকম্মো ছাড়া আর সব এক। তাদের চোখদুটো এক-ই রকম, গায়ের রঙ এক, মাথায় এক-ই রকম লম্বা।এদিকে হয়েছে কি, সেই রাজ্যের দিকে এক রাক্ষসের নজর ছিল। রাজ্যের সব ঘোড়া আর হাতিকে রাক্ষস খেয়ে ফেলল, তারপর যত সেপাই সান্ত্রীকে। তারপর রাজা আর রানিকেও গপ্‌ করে গিলে ফেলল। তখন খেলান আর দোলান বেশ বড় ছেলে। ওরা সেদিন খাটের নিচে ঢুকে লুকোচুরি খেলছিল তাই রাক্ষস ওদের খুঁজে পায়নি। খাটের তলা থেকে বেরিয়ে ওরা বলল “একি! আমাদের রাজ্যের সবাই রাক্ষসের পেটে চলে গেছে! ওকে শায়েস্তা করতে হবে”।
তখন খেলান আর দোলান ইচ্ছে করে হাতে দড়ি পাকিয়ে নিয়ে রাক্ষসের অপেক্ষায় খাটে উঠে শুয়ে রইল। রাক্ষস এল হাঁউ-মাঁউ-কাঁউ বলে মানুষের গন্ধ পেয়ে। এক গরাসে গপ্‌ করে যেই খেলান কে খেতে গেছে অমনি দোলান ওর হাতের দড়ি দুলিয়ে দিল, আর সেই দড়ি রাক্ষসের চারিদিকে পাক খেয়ে জড়িয়ে গেল। রাক্ষস বন্দী হয়ে গেল। খেলান তো খুব ভাল খেলতে পারে, সে তখন রাক্ষস কে লাট্টুর মতন ঘোরাতে লাগল, দড়িটাকে লেত্তি করে। রাক্ষস বাঁই বাঁই ঘুরতে লাগল সেই সঙ্গে ওর মাথা ঘুরতে লাগল। তখন দোলান তাকে তুলে নিয়ে দোলাতে শুরু করল। অমনি হড়হড় করে রাক্ষস বমি করে ফেলল,আর ওর পেট থেকে রাজা, রানি, মন্ত্রী, সেপাই, সান্ত্রী, হাতি, ঘোড়া সব বেরিয়ে এসে আবার দিব্যি আগের মতন হাঁটা চলা করতে লাগল।


পাখির কাছে শেখা


সৌরজ্যোতি বক্সী (বয়স-৮)

প্রতিদিন সকালে আমি যখন ঘুম থেকে উঠি দেখি একটা ছোট্ট সুন্দর নীল-হলুদ রঙের নাম না জানা পাখি আমাদের কাঁচের জানলার বাইরে এসে বসে। পাখিটা কাছেরই কোনো গাছে থাকে বোধহয়। ছোট্ট সরু ঠোঁটটা দিয়ে জানলার কাঁচের ওপর নিজের ছায়াটাকে রোজ কিছুক্ষণ ঠোকরাতে থাকে সে। ও আমাকে রোজ স্কুলের জন্যে তৈরী হতে দেখে। আমি ওকে আসতে দেখলে ভীষণ খুশী হই আর মাঝে মাঝে ভাবি ইস ওর কি মজা !! ওকে স্কুলে যেতে হয়না,রোজ পড়তে বসতে হয়না,হোমওয়ার্ক ক্লাসটেষ্ট কিচ্ছু নেই । আবার কখনো বা আমার মনে হয় শুধু উড়ে উড়েই ও নিজের কত সময় নষ্ট করে !! কিন্তু ওর মতন উড়তে পারিনা বলেও আবার আমার খুব দুঃখ হয় জানো !

আমার বাবা-মা বলে যে ওরা পাখি তাই ওরা গাছে থাকে,খড়কুটো বা শুকনো কাঠি খুঁজে এনে বাসা বানায়,ডিম পাড়ে,ডিমে তা দেয়,খাবার সংগ্রহ করে এনে বাচ্চাদের খাওয়ায় । ওটাই ওদের কাজ।

যেমন আমার কাজ পড়াশোনা করা,বাবা মা আর গুরুজনদের কথা শোনা আর সময়ের কাজ সময়ে করা ।

পাখি যেমন নিজের কাজ নিজেই করছে আমাকেও তেমনি আমার কাজগুলো সুন্দরভাবে নিজের মতন করে করতে হবে।তবেই তো আমি বড় হব,প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠব। 
অভাবপূরণ
শ্রেয়া বিশ্বাস (বয়স ৯)

এক গ্রামে এক ধনী শেঠজি ছিল।শেঠজির মনটা ছিল বড্ড ভাল।প্রতিদিন ভোরে মন্দিরে গিয়ে শেঠজি গরীব বাচ্চাদের খাবার-দাবার,জামাকাপড় বা কিছু না কিছু দান করে আসত।তাই শেঠজি মন্দিরে এলেই গরীব অনাথ বাচ্চারা ছুটে এসে তাকে ঘিরে ধরত কিছু পাবার আশায়।শেঠজি রোজই মন্দিরে আসেন, দানধ্যান করেন কিন্তু রোজই লক্ষ করেন যে একটা ছোট্ট মেয়ে কোনদিন তাঁর কাছে ছুটে আসেনা ,দূরে দাঁড়িয়ে কেবল তাকিয়ে থাকে। একদিন শেঠজি নিজেই তার কাছে যান,জানতে চান “কি ব্যাপার মা,সব্বাই আসে তুই তো কোনদিন আমার কাছে কিছু চাসনা,তোর খিদে পায়না ?”

“আমার চাইতে ভাল লাগেনা বাবা,আমি চাইনি বলেইতো তোমার মতন একজন বড় মানুষ আজ নিজে আমার কাছে এল।ঈশ্বর যার জন্যে যেদিন যেটুকূ খাবার মেপে রেখেছেন সে সেদিন সেটুকুই খেতে পায়”। মেয়েটির কথা শুনে শেঠজি মুগ্ধ হয়ে গেলেন এবং তাকে নিজের মেয়ের মতন করে মানুষ করার জন্যে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন ।এরপর ঐ অনাথ মেয়েটিকে তিনি অনেক লেখাপড়া শেখালেন এবং নিজের মনের মতন করে তাকে মানুষ করলেন।মেয়েটির কোনদিন আর কোনকিছুর অভাব রইলনা ।

রাজা আর সেই দুখীনি বৃদ্ধা
আবীরা মুখার্জী (বয়স-৮)

একদিন রাজা আর সুনীল বিকেলে খেলতে বেরিয়েছে।রাস্তায় তারা দেখল একজন গরীব বৃদ্ধা পথের ধারে শুয়ে রয়েছে।রাজা এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল “তুমি এখানে শুয়ে আছো কেন?কত গাড়ী চলছে,সরে যাও ,ওঠ এভাবে রাস্তায় শুয়ে থেকনা,দুর্ঘটনা ঘটতে পারে”।

-“আমার নড়াচড়া করার শক্তি নেই বাবা,তিনদিন হল আমি কিছু খাইনি”...বৃদ্ধার কথায় খুব দুঃখ হল রাজার।সে এক দৌড়ে বাড়ি গেল,মাকে গিয়ে বল্ল,”আমায় কিছু খেতে দেবে মা?”রাজার মা রাজাকে খাবার জন্যে কয়েকটা কেক,বিস্কুট আর মিষ্টি দিলেন।রাজা সেগুল নিয়ে দে ছুট। বৃদ্ধার কাছে এসে বলল “এই নাও ওঠ ,খেয়ে নাও এগুলো”।বৃদ্ধা পরম তৃপ্তি দিয়ে খাবারগুলো খেয়ে রাজাকে অনেক আশীর্বাদ করলেন “তুমি বড় ভাল ছেলে বাবা,ভগবান তোমার মঙ্গল করুন”। বাড়ি ফিরে রাজা তার মাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। সব শুনে মা বললেন, “আমি খুব গর্ববোধ করছি রাজা,এমনিভাবেই সবসময় তুমি গরীবদের সাহায্য করবে”। রাজা বলল “আমি প্রাণপণ চেষ্টা করব মা”

। 


উফফ্‌, নাকটা গেল রে !!
রৌনক রায় (বয়স ৯) 

ছোট্ট বালু বাঁদর দিনরাত গাছে ঝোলে আর বদমায়েশি করে ।এটা ছুঁড়ছে,ওটা ফেলছে,পাখিদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে এই ওর কাজ,জিনিস ছোঁড়া আর নষ্ট করা ওর যেন একটা স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে ।ভাল ভাল পাকা পাকা ফল নিজেও খাবেনা কাউকে খেতেও দেবেনা,সব কেবল ছুঁড়ে ছুঁড়ে নষ্ট করবে।একদিন টুইটু নামের একটা ছোট্ট মিষ্টি পাখি একটা পাকা পেঁপে দেখে খেতে নেমেছে ঠিক সেই সময় বালু সেটাকে ছিঁড়ে নিয়ে থপ্‌ করে ছুঁড়ে মারল জঙ্গলের ভেতর।“যদি খাবেইনা তাহলে ফলটাকে অমনি নষ্ট করলে কেন?”-জিজ্ঞাসা করল টুইটূ। “যাও যাও,নিজের কাজ কর গিয়ে বেশি পাকামি করতে হবেনা তোমায়,বেশ করেছি ছুঁড়েছি,আমার যা খুশী করব,তোমার তাতে কি?”-জবাব দিল বালু।বলতে বলতেই বালুর চোখে পড়ল একটা রবারের লাল রঙের বল,যথারীতি সেটা তুলে ছুঁড়ে মারল বালু।বলটা লাগল গিয়ে সামনের গাছে,আর সঙ্গে সঙ্গে সটান ফেরত এসে সোজা বালুর নাকে। “উউউউউউহ্‌,আহহ্‌,মাগো,গেলাম...নাকটা গেল রে !!!” চিতকার করে উঠল বালু।টুইটূ পিছন ফিরে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল”আর কোনদিন ছুঁড়বে জিনিস অমনি করে?” “না ,আর কখখনো নয়,খুব শিক্ষা হল যা হোক”-জবাব দিল বালু ।

আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু 
সঙ্কর্ষণ সেনগুপ্ত (বয়স-১০)

প্রত্যেক দিনের মতন সেদিন বিকেলেও আমি পার্কে গেছিলাম খেলা করতে।বন্ধুদের সাথে খেলায় মত্ত এমন সময় হঠাত কুঁই কুঁই করে করুণ সুরে একটা কান্নার মতন আওয়াজ।দেখলাম কিছু দুষ্টু ছেলে একটা বাচ্ছা কুকুরকে তাক্‌ করে ঢিল ছুঁড়ছে। আমার খুব রাগ হল।আমি ও আমার বন্ধুরা মিলে ছেলেগুলোকে বকা-ঝকা করে তাড়িয়ে দিলাম।দেখলাম কুকুরছানাটা বেশ আহত,ঠিকমত হাঁটতে পারছেনা।আমি কোলে করে তাকে বাড়িতে নিয়ে এলাম।মা তাকে একবাটি গরম দুধ দিল।সে চুক্‌চুক্‌ করে দুধটুকু খেয়ে নিল।কালোসাদা রঙের কুকুরছানাটির নাম দিলাম শ্যাডো-ইংরেজীতে যার মানে ছায়া।রাতে বাবা অফিস থেকে ফেরার পর আমরা শ্যাডোকে পশুদের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম।ডাক্তারবাবু তার পায়ে একটা ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দিলেন।বাড়ি ফিরে শ্যাডোর কি আনন্দ ! টুক্‌টুক্‌ করে লেজ নাড়াচ্ছে আর আমার পেছন পেছন ছুটে বেড়াচ্ছে।বাবা আর মা শ্যাডোকে বাড়িতে রাখতে রাজী হল।সেই থেকে শ্যাডো আমার সবসময়ের সঙ্গী।আমার তো ভাই-বোন নেই তাই শ্যাডোকে আমি আমার নিজের ভাইয়ের মতন ই ভালোবাসি।এখন শ্যাডোর বয়স এক বছর।রোজ যখন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরি শ্যাডো লাফিয়ে উঠে আমাকে আদর করে।বিকেলে আমার সাথে খেলা করে।সন্ধ্যেবেলা যখন পড়াশোনা করতে বসি আমার পায়ের কাছে চুপটি করে শুয়ে থাকে শ্যাডো।রাত্তিরে আবার আমার সাথে ছাড়া ঘুমায়না।মা বলে শ্যাডোর নামকরণ সার্থক,ও সত্ত্যি ই আমার ছায়াসঙ্গী।



বিশ্বকাপ নিয়ে
রৌণক বন্দ্যোপাধ্যায় (বয়স-১২ বছর) 

২০১০ সালের ১১ই জুন দক্ষিন আফ্রিকায় শুরু হল ১৯ তম বিশ্বকাপ।প্রথম ম্যাচ হল আয়োজক দক্ষিন আফ্রিকার সাথে মেক্সিকোর।দুটো দলই যদিও মাঝারি মানের তবুও বিশ্বকাপের ম্যাচ বলে কথা। কত কষ্টে সারা বিশ্ব থেকে মাত্র ৩২ টা দল উঠে এসেছে।এবার প্রথম আফ্রিকায় বিশ্বকাপের আসর বসেছে।রঙ্গের ছটা,নাচ-গানের ফোয়ারায় দারুণ ছিল সেই শুরুটা।ভারত কিন্তু বিশ্বকাপে নেই।শুধু এবারেই নয়,কোনবারেই থাকেনা।সেই একবার ১৯৫০ সালে খেলার সুযোগ পেয়েছিল ভারত কিন্তু তখন খালি পায়ে খেলত বলে’ফিফা’ খেলতে দেয়নি।তবুও বাঙ্গালী তথা ভারতবাসীর বিশ্বকাপ নিয়ে উন্মাদনার আর শেষ নেই। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনাকে নিয়ে তারা এখন দুই দলে ভাগ।এবারে তো আবার আর্জেন্টিনাকে নিয়ে মাতামাতি আরো বেশী১৯৮৬ র নায়ক দিয়েগো মারাদোনা যে এবারের আর্জেন্টিনার কোচ।আবার তাঁর সঙ্গে আছেন তাঁর শিষ্য,বাঁ পায়ে খেলা আরেক নক্ষত্র বার্সেলোনার সেরা স্ট্রাইকার লাওনেল মেসি।ওদিকে ৯৪ এর বিশ্বকাপ জয়ী দলের ক্যাপ্টেন এবার স্বয়ং কোচ ব্রাজিল দলের।স্পেনের এবার বিশ্বকাপ পাবার দারুণ একটা সুযোগ রয়েছে।টিমটাও অসাধারন সাজিয়েছেন ভিনসেন্ট।স্পেনের জাদু দেখার ইচ্ছে রইল।এছারা রয়েছে ইল্যান্ড।ফাবিও কাপেলোর হাতে পরে দলটা বেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে।জোহান ক্রুয়েফের হল্যান্ডও এবার বিশ্বকাপ জিততে মরিয়া।দেখা যাক শেশ পর্যন্ত কি হয়। ওয়াকা-ওয়াকা !!!
সংগ্রহে- আবু রায়হান

ব্যাখ্যান


ব্যাখ্যান
নার্গিস নাহার

তারপর রোদের তেজ আরও একটু বাড়লে পরেই ব্যা ফিরত ঘরে। ওর মা শ্রীমতী ব্যা-মা কচি ঘাসের আর কাঁঠাল পাতার প্রাতরাশ তৈরি করে রাখতেন ওর জন্য। ব্যা ঝর্নার জলে একটা ঝপঝপ পরিস্কার স্নান সেরে, মা-এর হাতে কাটা প্রাতরাশ খেত গব গব করে। তারপর চলে যেত - - - ।ব্যা-জার পণ্ডিতের আখড়ায়। সেখানে ব্যা-কার ছাড়াও আরও অনেক ছাগলছানা আসত। আখড়াটাকে ব্যা-জার পণ্ডিত বলতেন ছাগলছানাদের মন্দির। সেখানে গেলেই ছাগলরা ছাগলের মতো ছাগল, বড় ছাগল আর ভালো ছাগল হতে পারে বলে মনে করা হতো।
এদিকে যতদিন যাচ্ছিল ব্যা-কারও তত ব্যাকুল হয়ে উঠছিল হাতে-কলমে ছাগলামি শেখার দিনগুলোর জন্য। বড় বড় ছাগলদের থেকে সে শুনেছিল যে সেই দিনগুলো সব দারুণ মজার দিন। তখন চলছিল ছাগল নিয়ে যাবতীয় প্রবাদ –প্রবচনের ক্লাস। তারপরে সেসবেরই হাতে-কলমে পাঠ হওয়ার কথা ছিল। তবে সাহিত্যে ছাগলদের স্থাণ নিয়ে ক্লাস হওয়ার পর থেকেই ব্যা ঠিক করেছিল যে ও পাঁড়েজীর ছাগলের মতো সাত হাত দাড়ি রাখবে। কী করে লম্বা দাড়ি রাখবে তা জানার জন্য সেই ক্লাসের পর থেকেই ও দাড়িওলা ছাগলদের আশে-পাশে ঘুর ঘুর করত। কিন্তু সাত হাত কেন সেসব ছাগলদের কারোরই সাত ক্ষুরও দাড়ি ছিল না। যত দিন যাচ্ছিল,ব্যা-কার ততই হতাশ হয়ে পড়ছিল। কেবল নিজেকে ওর সদ্য শেখা ব্যা-চারা শব্দটার নিদর্শন মনে হতে লাগল। তবু আশায় আশায় আখড়ায় যেত, হাতে-কলমে শেখার দিনে যদি কোন উপায় শেখা যায় সাত হাত দাড়ি বানানোর সেই ভেবে।
করেই একদিন ব্যাজার পণ্ডিত ঘোষণা করলেন যে সেদিন ছানারা সবাই ধোপাদের মাঠে যাবে। হাতে-কলমে “ছাগলে কিনা খায়” শেখার জন্য। খুব সাবধানে খেতে হবে ছানাদের। যা খুশি তাই খাওয়া চলবে, কিন্তু ডাণ্ডা খেলেই নম্বর কাটা যাবে।
ধোপার মাঠে পৌঁছেই ব্যা-কার খুব হকচকিয়ে গেল। ভাদ্রমাসের দুপুরে যেন দোলের সকাল চলে এসেছে। হরেক রঙে চারদিক ছেয়ে গেছে। এমন সময় ব্যা-জার পণ্ডিত কাজ শুরু করার সঙ্কেত ব্যা-ধ্বনি দিলেন। ছানারা সব হুটোপুটি করে মেলে রাখা কাপড়ের আনাচে-কানাচে ছুট লাগাল।
ডাণ্ডা থেকে বাঁচতে ব্যা-কার একটা চার থামওয়ালা চাঁদোয়ার নিচে দাঁড়ালো। দেখল চাঁপা রঙের খসখসে কিন্তু নরম নরম একটা কাপড় ঝুলছে চোখের সামনে। কালক্ষেপ না করে ব্যাকার সেটা মুখে পুরে দিল। কিন্তু ব্যা-জার পণ্ডিতের আগেই একটা দুপেয়ে খুব শোরগোল তুলে ব্যা-কারের দিকে তেড়ে এল। ব্যা-কার কিছু বোঝার আগেই থাম চারটে নড়ে গেল, আর চাঁদোয়া সুদ্ধু চারটে থাম এক ঝটকায় হাম্বা ডাকে পিছিয়ে গিয়ে দিলো ছুট। প্রথম লাফে ব্যা-কারও পিছিয়ে গিয়েছিল। পরে থাম চারটে দৌড় শুরু করতে ব্যা-কার ক্ষুরের ঠোকাঠুকিতে প্রায় কিমা হয়ে যাচ্ছিল আরকি। দম নিতে থাম চারটে যেই একটু দাঁড়াল, ব্যা-কার চাঁদোয়ার তলা থেকে বেরিয়ে এল। তারপর থাম চারটে নিজের মতো চলে গেল। ব্যা-কার ফিরে গেল নিজের ঘরে।
পরদিন আখড়ায় গিয়ে ব্যা-কার শুনল যে আগেরদিনের ক্লাস ভেস্তে গেছে বলে, আবার সেই ক্লাসটাই হবে। যথা সময়ে ছানারা একটা লোকালয়ে এল। যেমন খুশি খাওয়ার পর্ব। অতএব চপের ফেলে দেওয়া ঠোঙা থেকে ঘুগনি চাটা শালপাতা সবের উপরই সমান প্রতিযোগিতা। কিন্তু ব্যা-কারের মাথায় ঘুরছে সেরা ছাগলছানা হওয়ার ফিকির। একদম অন্যরকম খুঁজতে খুঁজতে ও দেখল যে একটা বটগাছ তলায় একটা মানুষ শুয়ে আছে। তার হাঁটু সমান দাড়ি। ব্যা-কার আর লোভ সামলাতে পারল না। কে জানে, অমন লম্বা দাড়িটা খেলে যদি ওরও পাঁড়েজীর ছাগলের মতো লম্বা দাড়ি হয়। ব্যা-কার শুরু করল দাড়ির আগা থেকে চিবোন। ধুলোর মিষ্টি স্বাদ আর কিসের যেন নোনতা স্বাদ মিলে ব্যা-কারের খাবারটা স্বাদুই লাগল। তাই ক্লাস শেষের ব্যা-ধ্বনি হওয়া অবধি ব্যা-কার দাড়িই খেয়ে চলল। ব্যা-কারই সেরা ছাগলছানার শিরোপা পেল।
কিন্তু কদিন পর ওর সারা গায়ে সাংঘাতিক চুলকানি হল। ব্যা-মা ওর সারা গায়ের লোম ন্যাড়া করে দিলেন। পরে ছাক্তার দেখে শুনে বললেন যে মানুষের দাড়ি থেকে ব্যা-কারের গায়ে ছোট ছোট রক্তচোষা পোকা ঢুকেছিল; সেই পোকাগুলো চিবিয়ে খেলে নোনতা লাগে আর সেই পোকাগুলোই যখন গা থেকে রক্ত চুষে খায় তখন গা চুলকোয়।
যা হোক, এত কিছুর পর ব্যা-কারের দাড়ির কত বহর হয়েছিল সে কথা আর জানা যায়নি।

রান্না করলেন রাজপুত্র


রান্না করলেন রাজপুত্র
আসমা খাতুন
রাজা, রানি, রাজপুত্র, রাজকন্যা কে নিয়ে এক সুখের সংসার। কোন গোলমাল নেই,আবার গোলমাল আছেও বলা চলে।কারণ রাজা আর রানির মনে শান্তি নেই।একটাই কারণে। এই রাজ্যের রাজপুত্র যুদ্ধে যেতে চায়না,ফুটবল ক্রিকেট খেলেনা,এমনকি শিকারে যেতেও ভালোবাসেনা, একটাই জিনিষ ভালোবাসে,  সেটা হল রান্না করা। তার জীবনের সবচেয়ে বড় বাসনা সে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ রাঁধুনি হবে।রাজপুত্র সারাদিন রান্না ঘরে গিয়ে বসে থাকে, রাঁধুনিরা অতিষ্ঠ হয়ে যায়। এই লাও, ওই লাও। রাশি রাশি সবজি রাজপুত্র নিজের পরিকল্পনামাফিক কেটেকুটে ফেলে নতুন নতুন পদ রাঁধেন। পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। করলার পায়েস,লাউয়ের বিরিয়ানি, চিংড়িমাছের শুক্তো,অপরাজিতাফুলের চাটনি।
রাঁধুনিরা তো আর পেরে উঠছেনা বটেই, কিন্তু তার চেয়েও বেশী খারাপ অবস্থা রাজা রানি রাজকন্যার।রানিমা অবশ্য অন্যরকমের মানুষ। নিজে কোনদিন রান্নাঘরের ছায়াও মাড়াননি। শুধু পাড়ার লাইব্রেরী থেকে বই এনে এনে রাজ্যের ডিটেকটিভ গল্প পড়ে চলেন। কোন তাপ উত্তাপ নেই। আর রোজ সকালে রাজা আর রাজকন্যা গলায় বাইনোকুলার ঝুলিয়ে মৃগয়ায় যান। রাজার পুরোনো মোটরগাড়ি লোকলস্কর, ঘোড়া, কুকুর এসব তো সঙ্গে যায়ই। তো ফেরার পথে ওঁরা ওঁদের শিকার করা পশুগুলোকে সব জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসেন। কেননা বহুদিন হল ঘুমপাড়ানি গুলি ছাড়া আর কোন গুলি দেশে নিষিদ্ধ। যেখানে শিকার করার পর হাতে দু-চারখানা পাখি বা খরগোশ ঝুলিয়ে বা এক-আধখানা হরিণকে ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে আনা যায়না, সেখানে বুঝতেই পারা যাচ্ছে বাড়ি ফিরে রোষ্ট করে খাবার মতন কিছুই থাকছেনা। সুতরাং খিদে তে চনচন পেট নিয়ে ফিরেই রাজকন্যা দূত পাঠান পাশের রাজ্যের সীমার কাছে। সে রাজ্য থেকেই তো আসে যাবতীয় নন-ভেজ।পশুবধে ওখানে কোন নিয়ম-কানুন নেই।রাজকন্যার ফেভারিট হল তন্দুরি মুরগি আর মাছের চপ। কিন্তু সেসব খাবার আসার আগেই রাজপুত্র হাসিতে ঝলমল করতে করতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসেন, মাথার চুল খাড়া খাড়া আর চোখে কেমন একটা দুষ্টু ঝিলিক। তার মানেই কোন একটা নতুন রান্না আবিষ্কার হয়েছে। ভয়ে হাত-পা পেটে সেঁধিয়ে যায় রাজা আর রাজকন্যার।
অবশ্য তারপরেই একথালা ভাজাভুজি দেখে রাজকন্যা খুশিই হয় প্রথমে। কিন্তু এক কামড়েই তার দু-কান দিয়ে ধোঁয়া বেরোতে শুরু করে। শুকনো লঙ্কার সাথে দোপাটি ফুল মিশিয়ে পকোড়া বানানো হয়েছে, সে কী ঝাল!! অথবা কোনদিন সাদা ধবধবে ঝোলের ভেতরে কী সব যেন ভাসতে দেখা যায়। খেয়ে বোঝা যায় দুধ আর নারকেলের মিষ্টি ঝোলের ভেতরে সুপক্ক সুতিক্ত নিমপাতার বড়া। এমনি সব চমক অপেক্ষা করে থাকে রাজপুত্রের যেকোন রান্নায়।যতক্ষন না খাচ্ছ মজা বুঝতে পারবেনা।
কিন্তু হাজার হোক রাজপুত্র, তার একটা সন্মানের ব্যাপার আছে। খানসামা আর হুঁকোবরদারেরা যতই চোখ টিপে হাসাহাসি করুক, গম্ভীর মুখে রাজাকে সেসব খেতে হয়, রাজকন্যা বলে নীরবে নিজের জিন্সের পকেটে সেগুলো চালান করে দেয়। রানিমা নিজের ডিটেক্টিভ বইয়ের থেকে মুখ তুলে দেখেননা পর্যন্ত, আপনমনে কিছুই না বলে খেয়ে চলেন।
রাজাকে বাধ্য হয়ে মূল রান্নাঘরের দিক থেকে দূরে, গরুর গোয়ালের কাছে আর একটা বিকল্প রান্নাঘরের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। সেখানে রাজার খাস বাবুর্চি লুকিয়ে লুকিয়ে এমন সব খাবার বানায় যেগুলো দেখতে একেবারে রাজপুত্রের বানানো খাবারের মতই কিন্তু অনেক বেশী সুস্বাদু। সেজন্য একজন চর নিয়োগ করা হয়েছে, সে, রাজপুত্র যখন রান্না করেন তখন তার ঘাড়ের উপর দিয়ে উঁকি মেরে দেখে নেয় ঠিক কী রকম দেখতে হচ্ছে খাবারটা। ফিরে গিয়ে খবর দেয় বাবুর্চিকে। রাজপুত্র হয়ত বানাচ্ছেন টোমাটোর কেক আর গেঁড়িগুগলির ইডলি, বাবুর্চি অমনি বানাতে বসেন চেরি দেওয়া কেক আর ইডলিতে জমান পেঁয়াজ আর সর্ষের ফোড়ন। আর খাড়া চুল আর চকচকে চোখ নিয়ে রাজপুত্র যেই তার বানানো পদগুলো সগর্বে রাজার সামনে
এনে হাজির করেন, বাবুর্চি তাঁর চরকে দিয়ে চোরাপথে রাজার টেবিলের তলায় সাপ্লাই দেন তাঁর তৈরী ঐরকম দেখতে খাবার দাবার। রাজা হাসতে হাসতে, রাজপুত্রের রান্না খাবার ভাণ করে দিব্যি সুস্বাদু খাবারগুলো সাঁটান। রাজকন্যাও বাদ পড়েননা। রাজপুত্র নিজে আর রানিমা অকাতরে ভয়াবহ রান্নাগুলো খেয়ে চলেন।
এইসব করতে করতে সবাই যখন ক্লান্ত, তখন একদিন ঘটল অঘটন। অবশ্য অঘটন ঠিক বলা যায়না রাজ্যের পক্ষে ব্যাপারটা ভালোই।পাশেই একটা জঙ্গলে ছিল একটা ডাইনি ছাউনি। একহাজার ডাইনির একটা কনফারেন্স ছিল সেদিন সেখানে। জানাই কথা ডাইনি রা ভীষণ ঝগড়ুটে হয়, আর কথায় কথায় উল্টোপাল্টা ম্যাজিক চালায়। তো ভেড়ার পিণ্ডি আর শূয়োরের হাড্ডি দিয়ে দুপুরের খানা যখন ঠিক জমে উঠেছে, কী যেন একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে হঠাত এক কমবয়েসি ডাইনির অন্যদের সাথে মারপিট লেগে গেল। গুচ্ছের অভিশাপ ছুঁড়তে ছুঁড়তে তখন ডাইনিরা ঐ উটকো ডাইনিটিকে তাড়িয়ে দিল, নিজেদের দুর্দান্ত লাঞ্চ বক্সের ভাগ দিলনা। পেটে ভয়ানক খিদে নিয়ে ঝাঁটায় চেপে এই ডাইনিটি আর কি করে হুশ করে উড়ে চলল যেদিকে দুচোখ যায়। আর পড়ল গিয়ে হাউইয়ের মতন আমাদের গপ্পের রাজার বাড়ির ছাতে।
একে মাথায় ঝগড়ার রাগ তার ওপর পেটে চুঁই চুঁই খিদে। ডাইনি থপ করে ছাদের ওপর বসে বসে ভাবছে কি করা। হঠাত সে পেল এক দারুণ গন্ধ। আসলে পাকশালায় রাজপুত্র তখন পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্যে ছিলেন। সবে পলতা শাকের মোড়কে ইলিশ মাছের টুকরোগুলোকে মুড়ে সেগুলোকে পিটুলিগোলার ঝোলে দিয়ে সেদ্ধ করতে যাবেন, ওদিকে আবার চামচিকের ঠ্যাং দিয়ে বানানো কাবাব গুলো বেশ হয়ে মত এসেছে। সেইসব গন্ধ গিয়ে পৌঁছল ডাইনির নাকে। আর অমনি তার খিদের ধার গেল বেড়ে, সে হড়বড় করে ঝাঁটায় চেপে ঝপাত করে এসে পড়ল একদম রান্নাঘরের মাঝে।ডাইনিকে হঠাত সেখানে দেখে তো রাজপুত্রের চুল খাড়া খাড়া, চোখ চকচকে হয়ে গেল। সবাই ভাবল আবার বুঝি নতুন কোন খাবার আবিষ্কার করেছেন তিনি। কিন্তু না, এবার আবিষ্কৃত হয়েছে, নতুন খাবার নয়,  নতুন খাইয়ে।
আধঘন্টা পরে দেখা গেল রাজপুত্র ডাইনি-কন্যার সামনে থালায় করে করে নানা আবিষ্কারের ফলাফল সাজিয়ে ধরেছেন, আর মহা তৃপ্তিতে ডাইনি সেগুলো চেটেপুটে খাচ্ছেন ।
তা দেখে সবাই হাঁ, রাজা ছুটে এলেন, রানি ছুটে এলেন। রাজপুত্রের খাবারের এতদিনে তবে একটু মর্ম বুঝল কেউ! কিন্তু আর যাই হোক, এ যে একজন ডাইনি, রীতিমতন ঝাঁটায় চড়া,মাথার চুলগুলো সব উলোঝুলো, তিরিক্ষি চেহারা। তবে একটা কথা বলতেই হবে, বয়সটা কম। আর পরনে ঝলঝলে গেঞ্জি আর টাইট্‌স। তবু ডাইনি তো! কথায় কথায় শাপ দিয়ে যে কাউকে সাপ, ব্যাং করে দিতে পারে। ভুল করে এক আধটা খাবার যদি আবার তার খারাপ লেগে যায়। খুব রিস্কের ব্যাপার।
তো রাজপুত্রের সাথে ডাইনির যেমন দু-মিনিটেই একেবারে আড্ডা জমে ক্ষীর হয়ে গেল, আর যেভাবে রাজপুত্র ওকে পদ্মপাতার পায়েস আর ব্যাঙ্গের ছাতার জিলিপি খাওয়াতে শুরু করল, তাতে খবরটাকে খারাপ বলবেন না ভাল, এটা রাজারানি ভেবেই পেলেননা। উলটে তাঁরা এমন ও ভাবলেন যে হয়তো ডাইনি এক-আধটা বরও দিতে পারে। যদিও ডাইনিরা কোন ভাল জিনিষ কখনো করতে পারে বলে কোন বইতে রাজামশাই কখনো পড়েননি।
শেষ অব্দি অবশ্য একটা ভাল জিনিষই হল, রাজপুত্র আর ডাইনি বিয়ে করল। আর ঝাঁটায় চেপে রাজপুত্র চলে গেল ডাইনিছাউনিতে, বেশীক্ষন লাগেনা সেখানে, একবেলার জার্নি। অবশ্য ঝাঁটার স্পীড ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার।
রাজারানিরা নিজেরা তো ঐসব রান্না খাবার দায় থেকে মুক্তি পেলেনই,তাছাড়া ডাইনিছাউনিতে রাজপুত্রের রান্নার কদর হল দারুণ। এখন রাজপুত্রের আবিষ্কার করা মাকড়শার জালের এক্সট্র্যাক্ট আর গাঁদাল পাতা-আরশোলার আচার প্যাকেটে করে শিশিতে করে বিক্রি হয়। ডাইনিদের সুপারমার্কেটে পাওয়া যায়।
সংগ্রহে- আবু রায়হান

ভূত না ভূতুড়ে


ভূত না ভূতুড়ে
শাহরিয়ার আলম (রিফাত)
গপ্পো টা অনেক দিন আগেকার, সেই আমার ছোট্টবেলার। তখন আমাদের শহর এতো ঝাঁ চকচকে ছিল না। চারিদিকে প্রচুর গাছপালা, বেশ ফাঁকা ফাঁকা। আমার বয়স তখন ১৩/১৪ হবে। এদিক সেদিক যাবার স্বাধীনতাও ছিল বিস্তর। আমরা কজন বন্ধু মিলে সাইকেল চড়ে শহরের আনাচে কানাচে সব জায়গায় ঘুরে বেড়াতাম।
তার মধ্যে গঙ্গার ধার টা ছিল বেশ মনোরম। কি সুন্দর গাছ গাছালি তে মোড়া। গঙ্গায় চান করতে যাবার ঘাট, সেখানে বাঁশের মাচা করা বসবার জায়গা .... সারা দিন ধরে ফুরফুরে হাওয়া খাবার আদর্শ জায়গা। চারি দিকে সবুজ আর সবুজ। মাচায় বসে বসে দেখতাম জেলেরা মাছ ধরছে, মাঝি হাল ধরা নৌকা নিয়ে লোক পারাপার করছে, মাছরাঙ্গা মাছ ধরছে আর পানকৌড়ি জলে ডুব দিচ্ছে।
গঙ্গার ধারে একটা পুরনো কালী মন্দির আর তার ধারেই শ্মশান। শ্মশান টাও ছিল সুন্দর গাছগাছালি তে মোড়া। সেই শ্মশানে গাছের ওপর মাচা করে তার ওপর একটা ঝুপড়ি বানিয়ে থাকতো এক গুণিন। সে নাকি মস্ত তান্ত্রিক। আর থাকতো এক ডোম (যে মরা পোড়ায়) আর এক মরুই পোড়া বামুন (ব্রাহ্মন-মরা পোড়ানোর আগে যে শেষ ধার্মিক আচার আচরণ পালন করায়)।
ছেলেবেলা থেকেই আমি ছিলাম একটু বেশি সাহসী। দুপুর বেলা এর ওর গাছ থেকে পেয়ারাটা জামটা আমটা পেড়ে আনা। গঙ্গায় চান করতে গিয়ে জলের তলায় দম বন্ধ করে অনেক ক্ষন বসে থেকে অন্যদের ভয় পাইয়ে দেওয়া বা সাপের গর্ত থেকে লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে সাপ বের করে আনার মতো দুঃসাহসিক কাজ অনায়াসেই করতাম।
ঘুরতে ঘুরতে বহুবার শ্মশানে গিয়ে সেই গুনিনের তন্ত্র সাধনাও দেখতাম। আলাপ পরিচয় ও হয়ে গেছিল।কতবার লোকের গাছের ফল দিয়ে এসেছি গুণিন কে। গু্ণিন একাই থাকতো। আমরা গেলে বেশ আনন্দই পেতো। আমরা কজন বন্ধু মিলে গিয়ে ওনার থেকে নানা রকমের ভূতের গল্প শুনতাম। বয়স্ক লোক আর তাই কতই অদ্ভুত ঘটনার কথা বলতে পারতেন। তিনি আমাদের একবার এক ঘটনার কথা বলেছিলেন ভাবলে আজ ও শিহরণ জাগে।
তিনি নাকি ভূতেদের বশ করতে জানতেন। তার কথায় নাকি ভূতেরা ওঠা বসা করতো। আমি কিন্তু মনে মনে বেশ মজা পেতাম, গল্প শুনতে ভালো লাগলেও কোনোদিনই ওনার কথা বিশ্বাস করতাম না। ভূত বলে আবার কিছু আছে নাকি ?
যাই হোক ওনার সেই গল্পটা এবার সংক্ষেপে বলি। উনি নাকি পিশাচ সিদ্ধ। তন্ত্র সাধনা করে ওনার শক্তি এতই বেড়ে গেছিল যে অনায়াসে উনি ভূতেদের ডেকে এনে নিজের কাজ করাতেন। আমরাও দেখেছি তার আসনের সামনে একটা মড়ার খুলি থাকতো সিঁদুর মাখানো। এমনকি বেড়ালের মাথার খুলিও দেখেছি। ভূতেদের দিয়ে তিনি নিজের সেবা করাতেন আবার ওনার খাবারের ব্যবস্থাও নাকি ভূতেরাই করে দিত। কিন্তু এমনটাই বা আর কতদিন চলে? ভুতেরাও মনে মনে ভাবত যে আমরা এতো শক্তিশালী হযে একটা সাধারণ মানুষের সেবা করছি! কিন্তু উপায় কি- গুণিন যে পিশাচ সিদ্ধ। ওনার তন্ত্র সাধনার কাছে সবাই নতি স্বীকার করতে বাধ্য হত। তা এভাবেই বেশ চলছিল। হঠাৎ একদিন সুযোগ এসে গেল। সেই গুনিনের আফিমের নেশা ছিল। রাতের বেলায় আফিম খেয়ে ঝিমিয়ে থাকতো। সেদিন মাত্রা টা বোধহয় একটু বেশি হযে গেছিল। জেগে থাকলেও হুঁশ ছিল না। এই সুযোগেরই সদব্যবহার করেছিল এক ব্রহ্মদত্তি। ব্রহ্মদত্তি হলো অপঘাতে মারা যাওয়া ব্রাহ্মণ। সেই ব্রহ্মদত্তিটার চোখগুলো যেন এক একটা জ্বলন্ত আগুনের পিন্ড। বড় বড় গোল গোল টক টকে লাল। যেন সব কিছু জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেবে। সে সেই গুনিনের পাশে রাখা হ্যারিকেনটা দিল উল্টে। আর তাতেই আগুন ছড়িয়ে পড়ল গুনিনের ঝুপড়ি তে। সেই আগুনে ওনার মুখের এক অংশ পুড়ে যায়. সেই পুড়ে যাবার দাগ টা আমরাও দেখেছি। সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে গুনিনের গাছের ওপরের ঝুপড়িতে। সব কিছু নিমেষে ভস্মীভূত হয়। সে যাত্রায় ভাগ্যক্রমে শ্মশানের ডোমের নজরে এসে যাওয়ায় গুনিন প্রাণে বেঁচে যায়। এর পর ছিল বদলা নেবার পালা। পরের দিন ই গুনিন শুরু করে তার কঠোর তন্ত্র সাধনা আর সেই ব্রহ্মদত্তি কে বশ করে। সেই ব্রহ্মদত্তি নাকি আজও আটক রযেছে গুনিনের কাছে। এই অবধি শুনে আমি আর থাকতে না পেরে ফিক করে হেসে ফেল্লাম। তাই দেখে গুনিন গেল বেজায় চটে। বলল “আমার কথা তোর বিশ্বাস হচ্ছে না? যদি সাহস থাকে তাহলে আজ রাত বারোটার পর আয়, আমি তোকে দেখাবো আমার কয়েদি কে”।
সবাই তো গোল গোল চোখ করে তাকিয়ে আছে। আমি বল্লাম “ঠিক আছে আসবো”। মিথ্যে বলব না, মনে মনে একটু ভয় ও পেলাম। সাহসী হলেও অতো রাতে শ্মশানে যাব এতটা সাহসও ছিল না। বাড়ি ফেরার পথে বন্ধুরা জিজ্ঞেস করল ... “তুই কি সত্যিই আসবি নাকি রাতে?” আমি বল্লাম “হ্যা, নিশ্চয়ই, ভুত দেখার সুযোগ কি কেউ ছাড়ে?”
অনেক কিন্তু কিন্তু করেও রাতে আর যাওয়া হলো না. অনেক রাতে শুতে চলে গেলাম। মনে মনে কিন্তু ওই একই চিন্তা। গেলে কি সত্যিই ভুতের দেখা পেতাম? কেমন দেখতে ব্রহ্মদত্তি? গুণিন কি সত্যি কথা বলছে? নাকি জানে আমি ভয় পেয়ে গিয়ে যাব না। এই সব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছি ... আমার মাথার কাছে গুনিন দাঁড়িয়ে। আমাকে ডাকছে। “কিরে তোর সাহস শেষ হযে গেল? ভুত দেখতে যাবি না?” আমার হাত ধরে সে নিয়ে গেল শ্মশানে। গায়ের প্রতিটা রোম খাড়া হযে গেছে। আমি স্বপ্নেই দেখছি কত ধরনের ভূত গুণিনের সেবা করছে। তাদের গঠন ধোঁয়ার কুন্ডলির মতো। আকৃতি মানুষের মতো হলেও তাদের পা নেই। চোখ গুলো যেন আগুনের গোলা আর বেশ বড় বড়। মানুষের মতো সোজা নয়, একেবারে কপাল অব্দি টানা আর তারপরেই দেখি গুণিন আমার হাত ধরে শূন্যে উড়িয়ে নিয়ে গেল এক গাছের একেবারে মগ ডালে। সেখানে এক কাঠের তৈরী খাঁচা। তার মধ্যেই আটক এক বিশালকায় ভূত। এটাই নাকি ব্রহ্মদত্তি। চোখ গুলো সত্যিই জ্বলছে। টক টকে লাল। ধারের দুটো দাঁত বেশ বড়।আমার দিকে স্থির দৃষ্টি তে তাকিয়ে আছে।মনে হল যেন অজ্ঞান হযে যাব। বুকটা ধড়াস ধড়াস করছে। হঠাৎ ই ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। হার্ট -বিট মনে হয় ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। ঘেমে চান করে গেছি। চোখ খুলতেই সারা শরীর ঠান্ডা হযে গেল। স্বচক্ষে দেখছি সেই লাল চোখ।আমাকে গিলে খেতে আসছে। কোনো কথা বলতে পারছি না। গলার স্বর আটকে গেছে। সেই ব্রহ্মদত্তি কি তাহলে আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে? আমার ঘরে সে কি করে এল? গুনিন তন্ত্র সাধনার দ্বারা তাকে নিশ্চয়ই আমার কাছে পাঠিয়েছে। উঠে দাঁড়াতে গেলাম কিন্তু পারলাম না। লাল চোখের দিকে তাকিয়ে অচেতন হযে যাবার উপক্রম। কিছুক্ষণের মধ্যে যেই চেতনা ফিরল অবাক হযে গেলাম। আরে !!!!!!!!!! এটা ব্রহ্মদত্তির চোখ কোথায়? এ তো আমাদের বাড়ির সুইচবোর্ডের লাল আলোর ইন্ডিকেটারটা।মনে মনে নিজের ওপরেই হাসি পেল। কিন্তু হাসতে পারলাম না। সত্তিই কি ভূত বলে কিছু আছে নাকি? সবটাই তো কেমন ভূতুড়ে।
সংগ্রহে- আবু রায়হান

জামপাতা


জামপাতা
শামীম হোসেন

ঠিক তখনি , গরু টা গাছ থেকে নেমে , পুকুর পারের কচি ঘাস এ মুখ দিল। যেন কিচ্ছু হয়নি , শুধু ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছিল টিয়া পাখি টা, তবে তখন সূয্যি পশ্চিমে ঢলে পরেছে।

পুরনো জামা -কাপড়ের বদলে বাসন বিক্রি করে বেড়ায়, যেই লোকটা, তার নাকি দুটো ছেলে। একজন সকালে আসে, আর একজন বিকেলে। জমজ। চিনে বোঝার উপায় নাই। পুকুর পারের বড় জাম গাছটার নিচে তারা রোজ দুপুরে ঝিমোয়, রুটি খায়, গুড়, কখনো আচার।

শুধু গন্ডগোল বাধায় টিয়া গুলো, ঝাঁক বেঁধে এসে, সারাক্ষণ "ট্যা ...ট্যা "। ঘুমোবার, থুড়ি ঝিমোবার যো নেই। পুরনো শাড়ি বা চাদর মাথায় মুড়ি দিয়ে এল তাকে আড়াল করেই, এক মুহুর্তের জন্য, মনে পরে যায়, গরু টা রোজই গাছ থেকে নেমে ঘাস খায়। সবজে সবজে রং, শিং দুটো লাল, মুখটা হাবাগোবা।

কখন একটা হবে , কাজে ফাঁকি দিয়ে চলে আসে।

ফিক করে হেসে, আড় চোখে দেখে নেই। টিয়া দের ঝাঁক এবারে পাড়ি লাগালো বলে। জাম পাতার ঝিলমিল এ অন্যরকম একটা রোদ। এই আছে, এই নেই। গুঁড়ি বেয়ে কাঠ -পিঁপড়েরা মিছিল করে চলেছে। ওরা কি বলে ?......"পাখা 
কৈ, পাখা কৈ"। আর কিছুদিন পর, ঝপঝপে জলে, ওদের পাখা গজাবে, সকাল বেলায়, ঘাসের উপরে অনেক অনেক পাখা।

তখন গরুটা এই দিকে আসবেই না।

"এই ওঠ ওঠ বেলা যে বয়ে গেল, অনেক দূর যেতে হবে যে ...."

খর্গজিৎ


খর্গজিৎ
মিনহাজ শারমিন
খর্গজিত এর বয়েস হয়েছে। দ্রুতগতি দুরের কথা, চলাফেরা করার সামান্য শক্তিটুকুও তার আজ নেই। দয়া করে তাকে কেউ একটু পাতা-লতা দিলে খাওয়াটা জোটে। নয়তো উপোষ করে থাকতে হয়। কতদিন হয়ে গেল সে একটু গাজরের স্বাদ পায়নি, তা সে নিজেও জানে না। রাস্তার ধারে একটা খালি জায়গায় চারিপাশে জাল দিয়ে ঘিরে পাড়ার ছেলেরা একটা ছোটোখাটো চিড়িয়াখানা বানিয়েছে। একটা এক্যুরিয়ামে কয়েকটা মাছ, ঝুলন্ত হাঁড়িতে কয়েকটা পাখী আর মাটিতে চারটে গিনিপিগের সাথে খর্গজিতেরও সেখানে জায়গা হয়েছে। তার অমন লাল লাল বড় বড় চোখদুটোতে এখন ছানি পড়েছে। একটু দুরের জিনিস আর দেখতে পারে না। অমন লম্বা লম্বা কান, সামান্য একটা পাতা গাছ থেকে পড়লে সে যার আওয়াজ পেত, আজ সেই কানে সে ভালো করে শুনতেও পায় না। পাড়ার ছেলেরা এই মিনি চিড়িয়াখানার সামনে সন্ধ্যেবেলায় অতো যে চেঁচামেচি করে ক্যারম খেলে, খর্গজিত’এর কানে তার বিন্দুমাত্র প্রবেশ করে না। অমন ধবধবে সাদা লোমগুলো জালের মধ্যের মাটি আর নিজের মলমুত্র লেগে আর সাদা নেই, অদ্ভুত কদাকার রঙে পরিনত হয়েছে। দেখে পাড়ার বাচ্চাগুলো নাক সিঁটকে বলে – ইসসস......খরগোশটা কি নোংরা দ্যাখ! শুনে খর্গজিতের খুব কষ্ট হয়। আজ ওকে এমন অবস্থায় দেখে বাচ্চাগুলো এমন বলছে। অথচ একদিন............! স্মৃতির ঝাঁপি খুলে খর্গজিত তন্ময় হয়ে যায়............... 

খর্গজিত চিরকাল এমন ছিল না। ছোটোবেলায় তার নাম ছিল খর্গদ্যুতি। তার দুরন্তপনায় বাবা-মা ব্যাকুল হয়ে উঠত। ধবধবে সাদা লোম, লাল টুকটুকে চোখ আর তিড়িংবিড়িং নৃত্য সব্বার দৃষ্টি আকর্ষণ করত। আর একটু বড়ো হতেই তাকে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়তে হলো কচ্ছপের সাথে। ততদিনে সেও পড়ে ফেলেছিল তার প্রপিতামহ আর কচ্ছপদের প্রপিতামহের দৌড় প্রতিযোগিতার কাহিনী। শুধু পড়াই নয়, পড়ে পড়ে মুখস্থও হয়ে গিয়েছিল। তাই তার সঙ্গে যখন কচ্ছপের দৌড় প্রতিযোগিতা হলো তখন সে মাঝপথে একটুও বিশ্রাম নেয়নি। একেবারে দৌড় শেষ করে থেমেছিল। না, কচ্ছপের সাথে দৌড়ে জিতেই তার দৌড় প্রতিযোগিতা শেষ হয়ে যায় নি। কচ্ছপের পর একে একে ইঁদুর, বেজী, ছাগল, কুকুর, শুয়োর, গরু, গাধা সবার সাথে তার দৌড় প্রতিযোগিতা হয়েছিল। একটা প্রতিযোগিতা শেষ হতে না হতেই আরেকটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছিল।

সে কখনো হারে নি, তাই তার নাম হয়ে গিয়েছিল খর্গজিত। আর তাই সে বিশ্রাম নিতেও পারেনি। একটু জিরোতে গেলেই প্রথমদিকে তার বাবা-মা আর পরে তার শুভানুধ্যায়ীরা বলেছে – না এখন নয়, পরে বিশ্রাম নেবে......তোমাকে আরো আরো আরো দৌড়াতে হবে...আরো...ও...ও...। দৌড়ের নেশায় সেও নতুন উদ্দ্যমে বার বার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

বাবা-মা কারো চিরকাল বেঁচে থাকে না। একসময় খর্গজিতের বাবা-মাও দেহ রাখলো। ইতিমধ্যে বিয়ে করে সংসার করে ছেলেমেয়েও হয়েছে খর্গজিতের। একসময় ছেলেমেয়েরাও বিয়ে-থা করে অন্যত্র ঘর বেঁধে সংসার করতে থাকে। তারপর এক বাদলভরা ঝড়ের রাতে আকস্মিক খর্গজিতের বৌ’ও মারা যায়। এই বিশাল দুনিয়ায় একা হয়ে যায় খর্গজিত। জঙ্গলে একা একা ঘোরে বা বাসায় চুপটি করে বসে থাকে। কিছুই ভালো লাগে না তার। একদিন কচ্ছপ, ইঁদুর আর বেজী এলো তার কাছে। তারা প্রথমে খর্গজিতের কুশল জিজ্ঞাসা করলো। তারপর গল্প শুরু করলো। যে বিশাল জঙ্গলে তারা থাকতো, কচ্ছপ কোনদিন সেই জঙ্গল পার হতে পারে নি। গল্পে গল্পে কচ্ছপ খর্গজিতকে জিজ্ঞাসা করলো – আচ্ছা খর্গজিত ! তুমি কতদূর গিয়েছিলে ? এই যে জঙ্গলটা, এই জঙ্গল পার হয়েছিলে তুমি ? খর্গজিত হেসে জবাব দিয়েছিল – হ্যাঁ, তা পার হয়েছিলাম বৈ কী ! শুনে কচ্ছপ বলেছিল – তাহলে তুমি নিশ্চয় সেই ছাতিমগাছটা দেখেছ......যে গাছে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী বাস করে ? কত সুন্দর সুন্দর গল্প শোনায় তারা দুজন...শুনলে মন ভরে যায়...তুমি নিশ্চয় তাদের মুখে অনেক অনেক গল্প শুনেছ...। কচ্ছপের প্রশ্নের উত্তরে খর্গজিত আমতা আমতা করে বলে – না তো ! আমার তো দেখা হয় নি তাদের সাথে! ইঁদুর তখন বলল – বাদ দাও ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর কথা......আচ্ছা, তুমি তো ওওওই সরোবর ছাড়িয়ে অনে......ক দুর গিয়েছিলে, তুমি কি দেখেছ ওই সরোবরে শীতকালে নানা রঙের পরিযায়ী পাখীরা দলবেঁধে এসে গানে গানে সরোবরটাকে কেমন মুখরিত করে রাখে ? শুনে খর্গজিত বলে – না তো ! কখনো শুনিনি তো ! তখন বেজী জিজ্ঞাসা করলো – আচ্ছা খর্গজিত ! ওই যে দুরের পাহাড়টা দেখা যাচ্ছে, তুমি ওই পাহাড় ছাড়িয়ে আরোওও দূরে গিয়েছিলে ? খর্গজিত কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাসলো, তার মানে ও যে গিয়েছিল সেটা জানালো। তখন বেজী বলল- তাহলে তো তুমি পাহাড়ের ওপর যে মন্দিরটা আছে সেটা নিশ্চয় দেখেছ ? খর্গজিত তখন বেশ লজ্জা পেয়ে বলে – না হে আমি ওটাও দেখিনি......আসলে দৌড়ের সময় আমি এত মন দিয়ে দৌড়েছি যে আমার চারপাশে কি আছে না আছে, কি হচ্ছে না হচ্ছে কিছুই খেয়াল করি নি......। সত্যি বলতে কি......খেয়াল করতে ইচ্ছেও করে নি...............

বলতে বলতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল খর্গজিত। হঠাত দেখে ইঁদুর আর বেজী দুজনে মিলে কচ্ছপের দুটো পা কামড়ে ধরে ছুটে পালাচ্ছে। কারণটা বোঝার আগেই এক ব্যাধ জাল ছুঁড়ে দেয় খর্গজিতের দিকে আর খর্গজিত ধরা পড়ে যায়। পরে এ হাত ও হাত হতে হতে এক হাট থেকে এই মিনি চিড়িয়াখানায়। স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে খর্গজিতের চোখের কোনা থেকে জল গড়াতে থাকে। সারাজীবন ধরে জেতার নেশাতে ছুটেই গেল............

দুটো বাচ্চা ছেলে-মেয়ে জালের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। খর্গজিতকে দেখিয়ে একজন অপরজনকে বলে – দ্যাখ দ্যাখ...খরগোশটার চোখ থেকে কেমন জল গড়িয়ে পড়ছে.........বোধহয় ও আর বেশীদিন বাঁচবে না রে...............

কূলবধূ


কূলবধূ
দেবশ্রী চ্যাটার্জী
সিরাজবাগের সদাশিব বাবু যেমন ধনী তেমনি মহৎ । নিজের কাজ ছাড়াও অন্য কোন মানুষের দরকারে অদরকারে ঝাঁপিয়ে পড়তে পিছুপা হন না তিনি । সৎ মানুষ হিসেবে তাঁর বেশ সুনাম আছে,তাঁর নিজস্ব ব্যবসা । চুমকি আর জরির শাড়ির দোকান ।তার দোকানে প্রচুর খদ্দের নিত্যি ভীড় করে থাকে । বিভিন্ন শাড়িতে চুমকির কাজ করার জন্য প্রচুর অর্ডার পড়ে ।জরির পাড় লাগাতেও ভীড় করে থাকে ছেলেমেয়েরা । পূজাপার্বণ আর অনুষ্ঠান এর মরশুমে সারা বছর ধরে তাই তার ব্যবসা রমরমিয়ে চলে ।

সদাশিব বাবুর পুত্র প্রদীপ ব্যবসায় বাবাকে সাহায্য করে প্রদীপের বিয়ের বয়স হয়েছে । সদাশিব বাবু কুলবধু হিসেবে এমন একজনকে আনতে চান যে রূপে-গুণে সুন্দর হবে । দূর দূর থেকে অনেক মেয়ের খোঁজ আসে , কিন্তু সদাশিব বাবুর কাউকে মনে ধরে না । আসলে ধরবে কি করে তারা যে সদাশিব বাবুর নেওয়া পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না । এই তো কদিন আগেই তিতাসপুরে নির্ঝর বাবুর মেয়ে দেখতে সদাশিব বাবু গেছিলেন। সব কিছুই তার ভালো লেগেছিল কিন্তু বাদ সাধল একটা জায়গাতেই । সে মেয়েকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, সে সাজগোজ করতে ভালোবাসে বলে প্রত্যেক মাসেই নতুন ধরণের কোন জরি বসানো শাড়ি দোকানে এলেই সে কিনে ফেলে , কিন্তু কদিন যেতে না যেতেই সে শাড়িতে তার অরুচি ধরে যায়। মন তখন ব্যাকুল হয়ে ওঠে আবার কোন ঝাঁ চকচকে নতুন শাড়িরজে । সদাশিব বাবু বুঝলেন এই মেয়ে তার পুত্রবধু রূপে এলে তার খরচ যোগাতে যোগাতে হিমশিম খাবেন তিনি আর তার ব্যবসার লোকন হবে। সঞ্চিত ধনে টান পড়বে। নাহ এ মেয়ে বাতিল । আবার নতুন করে খোঁজশুরু করতে হবে তাঁকে ।
এইরকম করে দিনের পর দিন কেটে যায়,মনের মতন আর কাউকে তিনি পান না । একদিন তিনি দোকানে বসে ভাবছেন কি করা যায়, এমন সময় একটি মেয়ে এল তার দোকানে । সে এসেই জিগ্যেস করল , “আচ্ছা আপনার দোকানে জরি বা চুমকি ছাড়া কোন শাড়ি নেই ?” সদাশিব বাবু তাকে এক পলক দেখে বললেন,-“কেন মা, আজকাল তো এইরকম শাড়ি সবাই পড়ছে, তুমি বুঝি এই ধরনের শাড়ি পরতে পছন্দ কর না ?” মেয়েটি হেসে উত্তর দিল-“আমিও পরতে ভালবাসি, তবে আমার ঘরে অনেক কাজ করা শাড়ি আছে, যা অনেক পুরোনো হয়ে গেছে কিন্তু জরির পাড় আর চুমকিগুলো  এখনও সুন্দর আছে, তাই আমি এমন শাড়ি জছি যাতে আমি সেই চুমকি আর জড়ি গুলো ছোট্ট আল্পনায় ভরিয়ে নতুন করে তুলতে পারি । আমি আঁকতে জানি ,তাই নিজেই সেসব এঁকে নিতে পারব। ” এই বলে মেয়েটি থামল । 
তখন সদাশিব বাবু তাকে সুন্দর দেখে অনেক শাড়ি বের করে দিলেন আর কথার ফাঁকে তার নাম কি, বাড়ি কোথায় আর বাড়ি্তে কে কে আছে জেনে নিলেন মেয়েটির নাম শ্রী। বেশ ছোট্ট নাম ও সুন্দর। বাড়ি গোপালবাগে।তার বাড়িতে তার বাবা, মা ও ছোট বোন ছাড়া কেউ নেই ।অল্প কয়েক বিঘে জমি আছে যেখানে তার বাবা ছোট্ট ছোট্ট চারাগাছের সৃষ্টি করে । তার পর হাটবারে সেই চারাগাছ বিক্রি করে দেয় । সারাদিন  গাছেদের যত্ন, নতুন কলম তৈরী , বীজের চারাদের দেখাশুনা করা এতেই সব সময় চলে যায় ।মা অনেক রকম সেলাই-ফোঁড়াই জানে । নানা রকমের সুতোর জালে শাড়ি, চাদর বুনে ফেলে অবসর সময়ে । ছোট্ট থেকে শ্রী তার মায়ের কাছে শিখতে শুরু করেছে হাতের কাজ । একটু একটু করে শিখে আজ সে নিজে বাড়িতে আরো অনেক কে শেখায় । এই ভাবেই তাদের সংসার চলে । মেয়েটি সম্পর্কে সদাশিব বাবু খোঁজ় নিয়ে এত কিছু জেনে মনে মনে খুব খুশী হলেন । যদিও দোকা মেয়েটি কে দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন । আজ আরও খুশী হলেন । এরকম মেয়েই তো তিনি খুঁজছিলেন । কিছু দিনের মধ্যেই তিনি মেয়ের বাড়িতে হাজির হলেন । মেয়ের বাবা , মা তো সদাশিব বাবুকে ফুল তোলা কার্পেটে বসালেন । ঘরের চারিদিকে চোখ বুলিয়ে সদাশিব বাবু বুঝতে পারলেন ঘরদোর গুছানো । দেওয়ালের কোণায় কোণায় হাতের কাজের নিপুণ ছোঁওয়া । এত কিছু দেখা সত্ত্বেও তার মনের মধ্যে ছোট্ট পরীক্ষা নেওয়ার ইচ্ছা জেগে উঠল। তিনি মেয়েটিকে ডেকে ঘি রঙের গরদের শাড়ি ও একটি আকাশী রঙের শাড়ি দিলেন । ইচ্ছা করে বললেন “এই শাড়ি দুটি তে কি কাজ করা যায় বলতো মা, আমি কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিনা, অথচ কম খরচে সুন্দর কোন কাজ আমাকে করে দিতে বলেছে একজন । তুমি বলতে পারো এত কম খরচে কি করে শাড়িটি সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা যায় ?” মেয়েটি এক পলক তাকিয়েই বলল, -“আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন , আমি দেখছি কি করা যায় ।”

সপ্তাহ পরে একদিন সদাশিব বাবু দোকানে বসে হিসেবের খাতা মেলাচ্ছেন, এমন সময়ে “আসতে পারি ভিতরে?” শুনে তাকিয়ে দেখলেন শ্রী এসেছে । হাতের প্যাকেট টি খুলে শাড়ি দুটি হাতে তুলে দিল মেয়েটি । নীল শাড়িটির অপূর্ব ঔজ্জ্বল্য যেন ঠিকরে পরছে চুমকির অসাধারণ কাজের স্পর্শে । ঘি রঙের শাড়িটিও যেন এক অন্য রূপ পেয়েছে হাতের তুলির টানে । সদাশিব বাবু খুশিতে ডগমগ হয়ে এক মুহুর্তও দেরী  না করে তার সাথে তার বাড়িতে গিয়ে তার বাবা মা এর সাথে কথা বলে ছেলের সাথে বিয়ে পাকা করে ফেললেন ।এতদিন ধরে এমনি এক কূলবধূই তো খুঁজছিলেন  তিনি যেতার ব্যবসার কাজে উন্নতির স্রোত বয়ে আনবে,শুধু তাই নয়, তার সাথে তার সাফল্যও চারিদিকে ছড়িয়ে পরবে।এতো অল্পে যে সন্তুষ্ট আর এমন যার ধীশক্তি আর ধৈর্য, সেই তো তাঁর যোগ্য কূলবধূ।

কাকের গল্প


কাকের গল্প
আইভি চট্টোপাধ্যায়

এ বছরে খুব গরম পড়েছে। ভোর না হতেই রোদের তাত বাড়তে থাকে, আর বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামলেও গরম কমে না। মাঝে মাঝে বিকেলের দিকে একটু বাতাস দেয়। কিন্তু চারদিকে বড় বড় উঁচু উঁচু বাড়ি, আকাশ দেখা যায় না এমন উঁচু বাড়িও আছে। ঘরে ঘরে যে বেশ বাতাস খেলে বেড়াবে সে উপায় নেই। এবছর তেমন করে কালবৈশাখীর ঝড়ও হয়নি। ঝড় হলে ঘরদোর নোংরা হয় ঠিকই, তবে গরম তো কমে।এই গরমে পাখিদের কষ্ট সবচেয়ে বেশি। যত বড় বড় বাড়ি, রাস্তা তৈরি হচ্ছে, ততই ওদের থাকার জায়গা কমে যাচ্ছে। বড় বড় গাছের পাতার আড়ালে সারাদিন বসে থাকবে, সে উপায় নেই। গাছগুলোই কেটে ফেলা হচ্ছে যে। ভালো করে আকাশে উড়তেও পারে না আজকাল। কতরকম তার ঝুলছে চারদিকে। ইলেকট্রিকের তার, টেলিফোনের তার, কেবলটিভির তার। যত জলাজায়গাগুলো মাটি ফেলে বুজিয়ে দিয়ে বাড়ি তৈরি হচ্ছে। একটু জল খুঁজতেও যে কি কষ্ট!
অনেক পাখিরা তাই জঙ্গলে চলে গেছে। তাদের আর শহরে দেখা যায় না।
কিন্তু বেশ কিছু পাখি আছে, তারা শহরে থাকতেই ভালোবাসে। মানুষের সঙ্গে থাকতে ভালোবাসে। এই পাখিরা শহরে মানিয়ে নিয়েছে। গাছ নেই, তাই বাড়ির কার্নিশে বারান্দায় ছাদে বসে থাকে। কখনো বা কোনো তারে বসে দোল খায়। আর কোথাও একটু জলা জায়গা পেলে তো কথাই নেই। সকাল দুপুর বিকেল, সেখানে পাখির মেলা।
ভোর হবার আগে থেকেই তাদের ব্যস্ততা শুরু হয়। সূর্য ওঠারও আগে .. যেই অন্ধকার কম হয়ে আকাশটা আলো আলো হয় .. নীল আকাশ দেখা যায় .. অমনি পাখিরা বেরিয়ে পড়ে। কিচির মিচির কাকলি। আকাশ বাতাস জুড়ে পাখিদের গান শোনা যায়।
কোকিল, পাপিয়া, দোয়েল, টুনটুনি, বেনেবউ, টিয়া, চড়াই, শালিখ, পায়রা, বুলবুলি সব্বাই বেরিয়ে পড়ে। ভোর হতে না হতেই মোরগ গলার শিরা ফুলিয়ে ডেকে ওঠে, ‘কোঁকর কো’ ..
শিশিরভেজা ঘাসে, জলের ধারে ধারে ঘুঘুপাখিরা গলা ফুলিয়ে ডাকে, ’কেষ্টঠাকুর-র-র- ওঠ ওঠ’ ..
গম্ভীরগলায় কাক ডাকে, ‘ক্কঃ ক্কঃ’ ..
তখনও রাস্তায় গাড়ি চলা শুরু হয় না। ফাঁকা রাস্তায় পায়রাদের সঙ্গে সঙ্গে কাক খুঁটে খুঁটে খাবার জোগাড় করে। লম্বা একটা ল্যাজঝোলা পাখি ঘাসের মাটি থেকে ঠুকরে ঠুকরে কি সব খায়, আর সকাল থেকেই শালিখদের সঙ্গে গলা দুলিয়ে ঝগড়া করে। পাশের আমগাছটায় একজোড়া বুলবুলি পাখি থাকে, তারা এ সময় শিস দেয়। বোধহয় ঝগড়া থামানোর জন্যেই।
একটু আলো ফুটলেই পাখিরা পার্কের লেকের কাছে উড়ে আসে । মর্নিংওয়াকের মানুষজন এসে পড়ে । তার মধ্যেই পাখিদের ভিড়ও বাড়ে । একঝাঁক টিয়াপাখি এদিক সেদিক ওড়াউড়ি করে । দল বেঁধে পায়রা এসে পার্কের রাস্তায় বসে পড়ে ।
ক’দিন ধরে লেকের কাছে কয়েকটা বুনো হাঁস আসছে । এমনিতে হাঁসেরা আসে শীতকালে, এবছর ভুল করে এসময় এসে পড়েছে। ওরা সারাদিন জলে ডুবে থাকে । আগে আগে দুটো বক আসত । আজকাল দল বেঁধে বক আসছে । বুনোহাঁস আর বক, দুই পাখির বেশ ভাব হয়ে গেছে । একসঙ্গে জল থেকে মাছ আর পোকা ধরে খায় ।
মাছরাঙা পাখি সেই নিয়ে একদিন খুব রাগ করছিল। এমনিতেই গরমে খাবার খোঁজায় কত কষ্ট । তার মধ্যে রোজই জলের ধারে পাখির ভিড় বাড়ছে।
লেকের ধার ঘেঁষে একটা মস্ত শিমুলগাছ । তারপর পার্কের পাঁচিলের সঙ্গে সারি দিয়ে পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, জারুলফুলের গাছ । তারপর পাশাপাশি দুটো ছাতিমগাছ । একটা আমগাছও আছে । এই সকালে গাছে গাছে পাখির হুল্লোড় ।
আমগাছের ডালে ডালে সবচেয়ে বেশি পাখি থাকে । সকালবেলা সবাই বাসা ছেড়ে বেরিয়ে এসে জলার ধারে বসে । বক আর হাঁসেদের সঙ্গে গল্পগুজব করে, তারপর হয়ত অন্য কোনো গাছে গিয়ে সেখানে অন্য কোনো পাখির বাসায় গিয়ে গল্প করে আসে । ছাতিমগাছের সবচেয়ে ওপরের ডালে বাবুইপাখির বাসা । মা-বাবুই বাসা থেকে মুখ বের করে গল্পগাছা করে ।
বাবুইপাখির বাসা এত সুন্দর যে একদিন বুনো হাঁসরাও এসে বাসা দেখে গেল । এমনিতে সব পাখিদের বাসাই বেশ সুন্দর, পরিষ্কার, পরিপাটি । শুধু কাকের বাসা ছাড়া ।
আমগাছের মধ্যে এক জায়গায় আলাদা করে বাসা করে থাকে একদল কাক । গাছের গুঁড়ির কাছে, ডালপালার মধ্যে কাঠকুটো দিয়ে হেলাফেলার বাসা । যেমন তেমন করে তৈরি বাসা, একটু ছিরিছাঁদ নেই । তার মধ্যেই যেমন তেমন করে ডিম রাখা, একটু জোরে হাওয়া দিলেই মাটিতে পড়ে যায় । তা নিয়ে কাকের মাথাব্যথা নেই । ওদের বাসায় এসে কোকিলপাখিও ডিম রেখে যায়, বোকা কাক বুঝতেই পারে না। নিজের ডিমের সঙ্গে সেগুলোকেও রেখে দেয় । সেই নিয়ে সব পাখিরা খুব হাসাহাসি করে ।
কাকের বাসায় কেউ বেড়াতে আসে না । কাকের সঙ্গে কেউ মেশে না । কাক দেখতে বিশ্রী, ডাকটাও বিশ্রী, কোনো গুণ নেই । কেনই বা মিশবে কেউ?
সাদা ধবধবে বক, সাদা সাদা হাঁস চারিদিক আলো আলো করে রাখে । সবুজ টিয়া, লাল ঝুঁটির মোরগ, লম্বা ল্যাজের বুলবুলি । শালিখপাখির হলুদ ঠোঁট গাঢ় বাদামী পাখনা । মৌটুসি ময়নার দলে এসে বসে, ছোট্ট চড়াইপাখি ফুরুত করে এসে বসে নীল কালো ডোরাকাটা বদরীপাখির পাশে বসে । আর অমনি একটা কি সুন্দর হাতে-আঁকা ছবি হয়ে যায় ।
একদল ময়ূর সুন্দর পেখম তুলে খেলে বেড়াচ্ছে, বড় ঝোলা ল্যাজের একটা সাদা পাখি এসে বসল ঠিক তাদের মধ্যিখানে । আর সময় বুঝে কোণাকুণি এসে বসল নীলকন্ঠ আর টিয়াপাখি । ব্যস, কেমন সুন্দর একটা আল্পনা হয়ে গেল ।
সবাই সুন্দর । রঙচঙে ঝলমলে। আর কাককে দ্যাখো কুশ্রী কালো । সকালবেলা সুন্দরী পায়রাদের দলে বসে দানা খুঁটে খায় যখন, সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয় । কি কুচ্ছিত, কি কুচ্ছিত । সাদা ঝুঁটির কাকাতুয়া পায়রাদের ডেকে নেয়, ‘এদিকে চলে এসো । কাকের সঙ্গে থাকতে হবে না ।‘
আবার পরের দিন দ্যাখো আবার কাক সুন্দর পাখিদের দলে খেলতে আসে। লজ্জা শরমের বালাই নেই ।
একদিন তো খুব মজা হয়েছিল । খুব বৃষ্টি হয়েছিল সেদিন। নীল পেখমে সবুজ পাখনা দুলিয়ে নেচেছিল ময়ূর । গানও গেয়েছিল । দেখতে সুন্দর হলে কি হবে ! ময়ূরের গানের গলা একেবারেই নেই । কোকিল আর দোয়েল খুব হেসেছিল সেই নিয়ে । কাকের আওয়াজ শুনলেও যেমন সবাই হাসে ।
বোকা কাকটা করেছে কি, পরের দিন ময়ূরের পালক লাগিয়ে সেজেগুজে ময়ূরের সঙ্গে ভাব জমাতে গেছে । কাক বোধহয় ভেবেছিল, গলার আওয়াজ একরকম বলে ময়ূর ওকে বন্ধু করবে । ময়ূররা সঙ্গে সঙ্গে কাককে মেরেধরে তাড়িয়ে দিয়েছে । সেই নিয়ে সেদিন সব পাখিদের কি হাসাহাসি ।
তবু লজ্জা নেই। সারাদিন ‘কা কা’ করে গাছে গাছে মাঠে বনে ঘুরবে । আর চিল, শকুন, বাজ .. যত রাগী রাগী পাখির সঙ্গে খুঁজে খুঁজে মাংস খাবে । তবু যদি চিলের মত অমন ডানা সোজা করে আকাশে পাক দিতে পারত । একলা পাখি হয়ে চিল মাঝে মাঝেই আকাশে পাক খায়, কি সুন্দর লাগে তখন । কাক অত উঁচুতে উড়তেই পারে না । তাই চিল, বাজ, শকুন, ঈগলদের সঙ্গেও ওর বন্ধু হয় না ।

কোনো গুণ থাকলে তো বন্ধু করবে ! অন্ধকারের পাখিরা, বাদুড় কিংবা প্যাঁচা, তারাও ওর চেয়ে ভালো । কেমন অন্ধকারে দেখতে পায় ।
লেকের ধারে মর্নিংওয়াকে আসা মানুষজনও বলে, ‘এত সুন্দরের মধ্যে কাকগুলোকে মানাচ্ছে না ।‘
কেউ কেউ পাথর ছুঁড়ে কাককে তাড়িয়েও দেয় । তবু আবার পরের দিন কাক এসে হাজির হবেই ।
গরমের কষ্ট, জলের কষ্ট, খাবার জোগাড়ের কষ্ট নিয়ে এমনিই পাখিদের ভালো লাগছে না । তার মধ্যে এই কাক নিয়ে ঝামেলা । জলের কাছে এমনিই পাখিদের এত ভিড়, কাকগুলো এসে ভিড় বাড়িয়ে দিচ্ছে । জোর করে এসে জল খেয়ে নেবে, উড়ে উড়ে জল নোংরা করবে, পাখিদের মুখের খাবার ছিনিয়ে নেবে ।
দেখেশুনে বুনো হাঁসের দল একদিন সব পাখিদের নিয়ে একটা সভা করল । কাকেদের অত্যাচার আর সহ্য হয় না । চোখের সামনে এত নোংরা কুচ্ছিত পাখি, সারাদিন ডাস্টবিনে নোংরা ঘাঁটে আর তারপর লেকের জল নোংরা করে । কাককে আর আসতে দেওয়া হবে না ।
পাখিরা মিলে কাককে গাছ থেকে তাড়িয়ে দিল । বাসা ভেঙে দিল, ডিমগুলো মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল । কাঠঠোকরা পাখি লম্বা ঠোঁট দিয়ে কাকেদের খুঁচিয়ে ভয় দেখিয়ে দিল । বাবা-কাক আর মা-কাক অনেকক্ষণ উড়ে উড়ে ভাঙা ডিমগুলোকে দেখল, তারপর কাঁদতে কাঁদতে জঙ্গলে চলে গেল ।
পাখিরা খুব খুশি । মানুষজনও খুশি । আর কালো বিশ্রী কাককে দেখতে হয় না । আর কর্কশ ডাকে মাথা ধরে না । সুন্দর সুন্দর পাখিরা উড়ে উড়ে আকাশটাকে ঝলমল করে রাখে । লেকের জলে এখন দুটো সুন্দরী রাজহাঁস ঘুরে বেড়ায় । কতরকম হলুদ, নীল, কমলা, সবুজ । কতরকম পালক । নীলকন্ঠ, বেনেবউ, ধনেশ, দুধরাজ, ছাতারে, বুলবুলি, শালিখ । পায়রার ঝাঁক ।
রোজ ভোরের সোনা মাখামাখি জলে, গাছের পাতায় । নীল সবুজ ঘাসের বন, লাল হলুদ ফুল । আর অনেক অনেক রঙ । ডানায় সোনালি লাইন মাথায় লালনীল মুনিয়া, সাদাটুপি লাল গির্দিপাখি, স্যাফরন গা লম্বা সাদাটে ল্যাজ গাঢ় নেভীব্লু দুধরাজ । ময়না, চন্দনা, দোয়েল, মৌটুসি .. নরম পাখির দল । আকাশের চিল, বাজ, শকুন, ঈগল .. শক্তিশালী পাখির দল । জোড়ায় জোড়ায় শালিখ । ঝাঁক বেঁধে পায়রা, বক, হাঁস । শুধু কাক নেই । কাক আর আসে না ।
এমনি করে দিন কাটতে লাগল । বুনো হাঁসরা অন্য দেশে উড়ে গেল । পেলিক্যান নামের আরো সুন্দর পাখি এসে লেকের জলে খেলা করে গেল । বর্ষা এল । শরত এলো । শীত এলো । কাক এলো না ।
বেশ চলছিল, কিন্তু কিছুদিন ধরে নানা মুশকিল দেখা দিয়েছে । গাছে গাছে পাখিদের বাসায় পোকামাকড় বেড়ে গেছে । বিষাক্ত সব পোকা ঘাসের মধ্যে, ক্ষেতের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে । আঁশটে গন্ধে আকাশ বাতাস ভরে যাচ্ছে ।
সুন্দর সুন্দর পাখিদের লাল নীল সবুজ পালক ভর্তি পোকা, সারাদিন ঠোঁট দিয়ে চুলকে চুলকে গায়ে ব্যথা । কোকিল খুব বিপদে পড়েছে । ওর ডিম রাখার জায়গা নেই । সব ডিম খেয়ে নিচ্ছে দুষ্টু বেড়ালরা । দিনে দিনে কোকিলের সংখ্যা কমে যাচ্ছে ।
প্রজাপতিদের অন্য বিপদ । সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে । শুঁয়োপোকা থেকে এতবেশি প্রজাপতি হচ্ছে যে আর থাকবার জায়গা নেই ।
মাথা দুলিয়ে প্যাঁচা ঠাকুর্দা বলল, ‘কাককে তাড়িয়েই সর্বনাশ হল ।‘ ওপরের আকাশ থেকে নেমে এসে শকুন আর বাজপাখিও বকাবকি করল । পাখিদের ডাক্তার, লম্বাগলার সারসপাখি বলল, ‘এখুনি কাকেদের ফিরিয়ে আনতে হবে । নইলে খুব বিপদ ।‘
পাখিরা খবর পেয়েছে, মানুষজনও নাকি হন্যে হয়ে কাককে খুঁজে বেড়াচ্ছে ।
দুধরাজ পাখি, খুব শান্তশিষ্ট, কাককে তাড়াবার দিনও সঙ্গে আসে নি । এখন পাখিদের সভায় এসে সুন্দর করে বুঝিয়ে দিল, কাক ছিল বলে কি কি সুবিধে হত সেই সব কথা ।
কি কি সুবিধে হত শুনে তো সবাই অবাক ।
এক একটা কাকের পরিবার মিলে নাকি চল্লিশহাজার শূককীট, শুঁয়োপোকা খেয়ে নেয় । কত যে পোকামাকড় খেয়ে নেয়, তার হিসেব নেই । সেই পোকামাকড়দের বেশিরভাগই ক্ষেতের ফসলের, গাছের ফলের ক্ষতি করে। তাই কৃষকরা আর বাগানের মালীরা কাককে খুব ভালোবাসে ।
সেইসাঙ্গে কাক খায় ইঁদুর। জ্যান্ত ইঁদুর, মরা ইঁদুর। কাক চলে গিয়ে ইঁদুরে ইঁদুরে দেশ ভরে যাচ্ছে । পোকামাকড়ে, বিষাক্ত কীটপতঙ্গে দেশ ভরে যাচ্ছে । জন্তুজানোয়ারদের আর পাখিদের তো বটেই, মানুষের ঘরে ঘরেও অসুখ বেড়ে গেছে । আবর্জনা বেড়ে গেছে । কাক নাকি একা একাই খুঁটে খুঁটে খেয়ে অনেক আবর্জনা পরিষ্কার করে পরিবেশ সুন্দর রাখে ।
আবার পাখিদের সভা বসল। বুদ্ধিমান পাখিরা কাকের গুণ ব্যাখ্যা করল । বিদেশ থেকেও জ্ঞানী পাখিদের ডেকে আনা হল। গম্ভীর ম্যাকাওপাখি এসেছে আফ্রিকা থেকে । সেই ম্যাকাও সুন্দর বক্তৃতা করে বুঝিয়ে বলল, কিভাবে কাক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে ।
‘পরিবেশ’, ‘ভারসাম্য’ .. এসব ভারি ভারি কথা পাখিরা তেমন বুঝল না অবশ্য । কিন্তু ম্যাকাওকে দেখে পাখিদের রঙ নিয়ে, রূপ নিয়ে আর অহঙ্কার করার কথা মনেও রইল না । যেমন বড়, তেমনি রঙ । সবুজ, নীল, লাল, হলুদ । এমন সুন্দর পাখি, সেও কিনা কাকের প্রশংসা করছে !
পাখিদের খুব লজ্জা করতে লাগল । সবাই বেশ বুঝতে পারছে, কাককে তাড়ানোটা ভালো কাজ হয় নি ।
ছোট্ট মৌটুসিপাখি ভ্যাঁ করে কেঁদেই ফেলল, ‘শিগগির কাকদাদাকে নিয়ে এসো । আর কিই বা এমন খারাপ দেখতে? কি সুন্দর কালো কুচকুচে ।‘
চন্দনা বুলবুলি বাবুই সবাই বলল, ‘গলার আওয়াজটাও খুব একটা খারাপ নয় ।‘
পাহাড় থেকে আসা নীল ময়না বলল, পাহাড়ে নাকি হলদে ঠোঁট লাল পায়ের সুন্দর কাকও আছে । সেই শুনে টিয়াপাখি বলল, ‘আমাদের কালো কাকই সুন্দর । রোজ ডাস্টবিনে বসে, তবু ওর গায়ে নোংরা লেগে থাকে না ।‘
সবাই সমস্বরে বলল, ‘আমাদের কালো কাকই ভালো । কালো জগতের আলো ।‘
ডাহুকপাখি লম্বা লম্বা পা ফেলে তখনই বেরিয়ে পড়ল । একঝাঁক পায়রা গেল দক্ষিণে, একঝাঁক টিয়াপাখি গেল পশ্চিমে । বকের দল সাদা পাখনা মেলে উত্তরের দিকে উড়ে গেল, মাছরাঙা পাখিরা গেল পূর্বদিকে । চিল আর বাজ অনেক উঁচু আকাশে গিয়ে চারদিকে খুঁজতে লাগল ।
শালিখ আর বাবুই মিলে আমগাছের দালে কাকের বাসা তৈরি করতে লাগল ।
জঙ্গলে জন্তুজানোয়ারদের সভা ডেকে সিংহরাজা আদেশ দিল, ‘সবাই মিলে কাককে খুঁজে বার করো ।‘ জঙ্গল জুড়েও ছুটোছুটি হুটোপাটি শুরু হল । যেমন করে হোক, কাককে ফিরিয়ে আনতেই হবে ।
মানুষরাও পিছিয়ে নেই। দিকে দিকে ‘কাক বাঁচাও কমিটি’, ‘কাক জাতীয় উদ্যান’, ‘কাক সোসাইটি’ তৈরি হল । পাঁচিলে, দেয়ালে, হোর্ডিঙে কাকের সুন্দর সুন্দর ছবি টাঙানো হল ।
এতজন মিলে এত ভালোবাসায় ডাকলে কি আর কাক না এসে পারে ?
বাড়ির বারান্দায়, স্টেশনের টালির ছাদে,স্কুলবাড়ির মাঠে কালো কালো কাকের দল আসতে লাগল আবার । পাখির দল এসে কাকের সঙ্গে খেলা করতে লাগল । কাকের আমগাছের বাসায় পাখিরা এসে গল্প করতে লাগল ।
আজকাল পাখিরা কাককে নিয়ে একসঙ্গে উড়ে যায় নীল জলের কাছে । রাজহাঁস লম্বা গলা দুলিয়ে হাসে ।
আকাশ বাতাস মেঘ বৃষ্টি গাছপালা সবাই জানে এখন, কালো কাক আসলে কত সুন্দর । পাহাড় টিলা জঙ্গল .. গাছে গাছে ফুল পাতা .. নদী নালা পুকুর । পাখির শিস । কাকের গম্ভীর ডাক ।সব মিলিয়েই জীবন । প্রকৃতির রূপকথায় কাউকে বাদ দেওয়া নেই ।
সংগ্রহে- আবু রায়হান